অর্থনৈতিক পটভূমি

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পশ্চাতে সাংস্কৃতিক অনেক কারণ ছিলো, সন্দেহ নেই। বাঙালি সংস্কৃতিকে স্বাধীনতার পর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন পশ্চিমে পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদীরা। কেননা পূর্ব ও পশ্চিমের অতি দুর্বল সাংস্কৃতিক যোগসূত্রকে তাঁরা মজবুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের কারণস্বরূপ অন্য একটি কথাও বিশেষভাবে মনে রাখা আবশ্যক যে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের পথে পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে সহনীয় করে তুলতে চেয়েছিলেন শাসক সম্প্রদায়। সম্মানজনক শর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতির সঙ্গেও বোধহয় সহাবস্থান সম্ভব, এবং তেমন অবস্থায়, একাত্মতা বোধ না করলেও, পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান একটি ঢিলে কনফেডারেশনের অধীনে হয়তো বাস করতে পারতো। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব বাংলাকে ব্যবহার করতে শুরু করলো উপনিবেশ হিশেবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে গেলো দেখতে দেখতে। অথচ দেশবিভাগের সময়ে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৫ ভাগ বাস করতেন।[*]বর্তমানে এ অনুপাত বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬-তে। গণতান্ত্রিক দেশ বলে পাকিস্তান প্রথম থেকেই দাবি করেছে; তেমন অবস্থায় পূর্ব বাংলায় উন্নয়ন কার্য বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থ ও রাজস্ব ব্যয়িত হওয়া উচিত ছিলো ৫৬ ভাগ। কিন্তু বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তানে—দেশের শতকরা ৪৪ জন লোকের জন্যেই ব্যয়িত হয়েছে দেশের মোট সম্পদের সিংহভাগ। ফলে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিপুল অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অবশ্য আজ পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে দুস্তর অর্থনৈতিক বৈষম্য রচিত হয়েছে তার পেছনে অনেকগুলো ঐতিহাসিক কারণ নিহিত আছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, স্বাধীনতাপূর্বকালে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এক রকমের ছিলো না। বৈষম্যের বীজ তখনই উপ্ত ছিলো। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রে প্রথমে থেকেই পিছিয়ে ছিলেন। সেখানে যে ছোটোখাটো শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ছিলো, তা নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরা। শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব করতেন হিন্দুরা। যে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন, অফিস-আদালতের নিম্নপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁরা। জমিদার, জোৎদার, আমলা, উকিল, ডাক্তার প্রভৃতি বললে তখন হিন্দুদেরই বোঝাতো।

অপর পক্ষে, পশ্চিম পাকিস্তান-অঞ্চলে এর ঠিক উল্টো অবস্থা দেখতে পাই। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, জমিদার, জোৎদার, আমলা, উকিল, ডাক্তার—সমাজের এ সমস্ত কুলীন পদগুলোর প্রায় সবটাই সেখানে আগে থেকে মুসলমানরা অধিকার করে ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, পশ্চিম পাকিস্তানের ল্যান্ড রিফর্মস কমিশনের হিশেবে দেখা যায়, জমিদার ও জায়গিরদারপ্রধান এই প্রদেশের ৬,০৬০ জন ভূস্বামী যে পরিমাণ জমির মালিক ছিলেন প্রদেশের ৩৩ লক্ষ কৃষকরা তার থেকে কম জমির মালিক। এঁদের মধ্যে কারো কারো মোট জমির পরিমাণ ছিলো ১১ লক্ষ একর। এই বৃহৎ ভূস্বামীরা স্বাধীনতারপূর্ব থেকেই জমির মালিক এবং এঁরা মুসলমান। পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং আমলারাও ছিলেন অধিকাংশ মুসলমান। এঁদের পক্ষে, স্বাভাবিকভাবেই, ইংরেজি শিক্ষার আধুনিকতম সুযোগ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। দেশবিভাগকালে, এ জন্যে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা বেশি; যদিও পূর্ব বাংলায়, আগেই বলা হয়েছে, শতকরা ৫৫জন লোক বাস করতেন। নিম্নের টেবল থেকে উভয় অঞ্চলের তৎকালীন শিক্ষিতের সংখ্যা বোঝা যাবে:


১৯৫১ সালের গণনা অনুসারে

মেট্রিকুলেটগ্রাজুয়েটপোস্ট-গ্রাজুয়েট
পূর্ব বাংলা২,৮২,১৫৮৪১,৪৮৪৮,১১৭
প. পা.১,৩৯,৬৯৮৪৪,৫০৪১৪,৭২৯

উৎস: Jayanta Ray; Democracy and Nationalism on Trial; Simla; 1968.

প্রারম্ভিক এই সুবিধার জন্যে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের সকল উচ্চপদে বসলেন অবাঙালিরা। এবং শুরু থেকেই অসম প্রতিযোগিতার দরুন আজও পূর্ব বাংলা অনেক পিছিয়ে আছে। এখনো পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো দপ্তরের সচিব হিশেবে কোনো বাঙালি নিযুক্ত হননি। অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী কিংবা পরিকল্পনা দপ্তরের অধিকর্তারূপেও

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion